মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন তার সম্ভাব্য সময়

Posted by

অর্থনীতি প্রতিদিন: বাংলাদেশে বর্তমানে এক ডজনেরও বেশি সংখ্যক মেগা প্রকল্পের কাজ চলছে।এসব প্রকল্পের মধ্যে কিছু রয়েছে, যেগুলোর কাজ পুরোপুরি শেষ না করেই গত নির্বাচনের আগে ‘আংশিক উদ্বোধন’ ঘোষণা করেছে আওয়ামী লীগ সরকার।আবার এমন প্রকল্পও রয়েছে, দফায় দফায় মেয়াদ বাড়ানোর পরও যেগুলোর নির্মাণ কাজ শেষ হয়নি।এতে একদিকে যেমন খরচ বেড়েছে, তেমনি দীর্ঘদিন নির্মাণ কাজ চলার কারণে সৃষ্ট ধুলা-বালি, শব্দ দূষণসহ নানান সমস্যায় ভোগান্তি বেড়েছে সাধারণ মানুষের।

খুলনা-মংলা রেলপথ: প্রকল্পটি তিন বছরে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও পেরিয়ে গেছে ১৩ বছর। মেয়াদ বাড়ার সঙ্গে প্রকল্পের খরচ বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি।একযুগ পর এখন বাণিজ্যিক চলাচলের জন্য লাইনটি প্রস্তুত বলে জানাচ্ছেন প্রকল্পটির পরিচালক মো. আরিফুজ্জামান।“আমাদের মূল নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। এখন ফিনিশিংয়ের কিছু কাজ চলছে। মার্চের মধ্য বা শেষভাগে বাণিজ্যিকভাবে ট্রেন চলাচল শুরু করতে পারবে” গনমাধ্যমে জানান তিনি। ট্রানজিট সুবিধার আওতায় ভারত, নেপাল ও ভুটানে পণ্য পরিবহন সহজ করতে ২০১০ সালে খুলনার ফুলতলা রেলস্টেশন থেকে মংলা বন্দর পর্যন্ত রেলপথ স্থাপন প্রকল্প হাতে নেয় সরকার।এরপর নানা জটিলতার পর নির্মাণ কাজ শুরু হয় ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে।শুরুতে প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল এক হাজার ৭২১ কোটি টাকা।গত এক যুগের সেটি কয়েক দফায় বেড়ে বর্তমানে ব্যয় দাঁড়িয়েছে চার হাজার ২৬০ কোটি টাকায়। তারপরও কাজ শেষ হয়নি।নির্বাচনের আগে গত বছরের পহেলা নভেম্বর অনলাইনে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে খুলনা-মংলা রেলপথ প্রকল্পের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।কাজ শেষ করতে এতো সময় লাগার পেছনে নকশা পরিবর্তন, ভূমি অধিগ্রহণে সময়ক্ষেপণ, মালামাল সরবরাহে দেরি, রূপসা নদীর ওপর রেলসেতু নির্মাণ, করোনা মহামারি-সহ নানার কারণ দেখাচ্ছেন প্রকল্পের কর্মকর্তারা।

ঢাকা-গাজীপুর বিআরটি প্রকল্প: খুলনা-মংলা রেলপথের মতো ঢাকা-গাজীপুর রুটের বিআরটি প্রকল্পটিও এক যুগ পার করে ফেলেছে। অথচ ২০১২ সালে সরকার অনুমোদন দেয়ার পর চার বছরের মধ্যেই কাজ শেষ করার কথা বলা হয়েছিল। পরে প্রকল্পের সময় আর ব্যয় বেড়েছে। সেই সঙ্গে বেড়েছে মানুষের ভোগান্তিও। অবশেষে প্রকল্পটির কাজ শেষ হতে যাচ্ছে বলে গনমাধ্যমে জানিয়েছেন প্রকল্পটির পরিচালক মহিরুল ইসলাম খান। “আমরা কাজ প্রায় শেষ করে এনেছি। চলতি বছরের ডিসেম্বরেই গাড়ি চলাচল করতে পারবে বলে আশা করি” বলেন তিনি।প্রকল্পের ধীরগতির বিষয়ে অবশ্য কোন মন্তব্য করতে রাজী হননি তিনি। ২০১১ সালে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক প্রকল্পের প্রাথমিক সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করে অর্থায়ন করেছে। ২০১২ সালের পহেলা ডিসেম্বর একনেক বিআরটি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। শুরুতে ব্যয় ধরা হয় দুই হাজার ৩৯ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। এরপর কয়েক দফায় মেয়াদ বাড়িয়ে প্রকল্পের সবশেষ ব্যয় দাঁড়িয়েছে চার হাজার ২৬৮ কোটি টাকা।

ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে: পুরো নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার আগেই নির্বাচনকে সামনের রেখে গত দোসরা সেপ্টেম্বর ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের আংশিক উদ্বোধন ঘোষণা করেছিল আওয়ামী লীগ সরকার।ফলে প্রায় ২০ কিলোমিটার এক্সপ্রেসওয়ের মধ্যে অর্ধেক, অর্থাৎ বিমানবন্দর থেকে ফার্মগেট পর্যন্ত এখন ব্যবহার করা যাচ্ছে। চলতি বছরের জুনের মধ্যেই এক্সপ্রেসওয়ের বাকি অংশের কাজ শেষ করে গাড়ি চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করার কথা রয়েছে।কিন্তু প্রকল্প পরিচালক বলছেন, চার মাসের মধ্যে কাজ পুরোপুরি শেষ করা সম্ভব হবে না।“আমাদের যে টার্গেট, ঐভাবে আমরা আগাচ্ছি। তারপরও হয়তো আরেকটু সময় লাগতে পারে”, জানান ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের প্রকল্প পরিচালক এ এইচ এম এস আকতার। সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের ফার্মগেট থেকে যাত্রাবাড়ী অংশের অনেক জায়গায় এখনও ঢালাই কাজ শেষ হয়নি। প্রায় আট হাজার নয়শ’ চল্লিশ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটির নির্মাণ কাজ শুরু হয় ২০২০ সালের জানুয়ারিতে। প্রকল্পটির নির্মাণকাজ পুরোপুরি শেষ হলে ঢাকা বিমানবন্দরের দক্ষিণে কাওলা থেকে উঠে যাত্রাবাড়ি পার হয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুতুবখালী পর্যন্ত একটানে গাড়ি যেতে পারবে।

বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল: ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের মতোই নির্মাণকাজ পুরোপুরি শেষ না করেই ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালটির ‘সফট ওপেনিং’ ঘোষণা করা হয়।নির্বাচনের আগে গত সাতই অক্টোবর টার্মিনালটির উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।বর্তমানে এই টার্মিনালের প্রায় ৯৩ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে বলে গনমাধ্যমে জানিয়েছেন প্রকল্প পরিচালক একেএম মাকসুদুল ইসলাম।“চলতি বছরের শেষ কিংবা আগামী বছরের শুরুর দিকে আমরা পুরোপুরিভাবে অপারেশনে যেতে পারবো বলে আশা করছি। সেভাবেই কাজ এগোচ্ছে” বলেন তিনি। প্রায় ২১ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন এই টার্মিনালের নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছিলো ২০১৯ সালের ২৮ শে ডিসেম্বর। জাপানের আর্থিক সহযোগিতায় সেদেশের মিৎসুবিশি, ফুজিটা এবং দক্ষিণ কোরিয়ার স্যামসাং যৌথভাবে টার্মিনালটির নির্মাণ কাজ করেছে। শুরুতে এ বছরের মধ্যেই টার্মিনালের সব কাজ শেষ করে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করার কথা জানিয়েছিলো কর্তৃপক্ষ। কিন্তু ইসরায়েল-গাজা যুদ্ধের কারণে বিদেশি নির্মাণ সামগ্রী আমদানিতে কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে। ফলে পুরোকাজ শেষ কিছুটা দেরি হওয়ার আশঙ্কা করছেন প্রকল্প পরিচালক। “শুরু থেকেই ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে আমরা মালামাল আনছি জাহাজে করে” বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি। “কিন্তু যুদ্ধ শুরু হওযার পর জাহাজ আসতে ডিলে হচ্ছে। এর ফলে অনেক সময় পরিকল্পনামতো কাজ এগোনো যাচ্ছে না” বলেন তিনি। তবে এই সমস্যা সমাধানে অবশ্য এখন বিকল্প রুট ব্যবহার করে নির্মাণ সামগ্রী আমদানির পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন তিনি। হাস্যকর আর অজুহাতে সিদ্ধ হস্ত পিডিরা।

পাতাল মেট্রোরেল: উড়াল মেট্রোরেলের পর এখন দেশের প্রথম পাতাল মেট্রো রেল নির্মাণের কাজ শুরু করেছে সরকার। এই প্রকল্পের আওতায় ৩১ কিলোমিটার মেট্রোলাইনে মোট ২১টি স্টেশন নির্মাণ করার কথা রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর রেল স্টেশন পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার পাতাল মেট্রোরেল নির্মাণ করা হবে। সেখানে ১২টি পাতাল মেট্রো স্টেশন রাখা হচ্ছে। আর পূর্বাচল রুটে ঢাকার নতুন বাজার থেকে নারাণগঞ্জের পিতলগঞ্জ পর্যন্ত প্রায় ১১ কিলোমিটার পথ উড়াল মেট্রোরেল নির্মাণ করা হচ্ছে।২০২৩ সালের দোসরা ফেব্রুয়ারি পাতাল মেট্রোরেলের নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কিন্তু এক বছর পর এসে প্রকল্পের তেমন কোন অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। পাতাল রেলের মূল নির্মাণ কাজ তো দূরের কথা, এখনও ভূমি অধিগ্রহণ ও উন্নয়নের কাজই শেষ করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। তিনি আরো বলেন, “বেশকিছু দিন পেরিয়ে গেছে, কিন্তু তারা এখনও কিছু জানাচ্ছে না। টেকনিক্যাল ও ফাইন্যান্সিয়াল মূল্যায়ন করে জাইকা সম্মতি দিলেই পুরোদমে কাজ শুরু হবে।”২০২৬ সালের মধ্যে প্রকল্পটি শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। অথচ কাজে এখনও দৃশ্যমান তেমন কোনো অগ্রগতি নেই। ফলে যথা সময়ে নির্মাণ কাজ শেষ করা নিয়ে দেখা দিয়েছে শঙ্কা।“আমাদের যে পরিকল্পনা ছিল, সেখানে ইতিমধ্যেই বেশখানিকটা পিছিয়ে পড়েছি। আমরা চেষ্টা করবো আগামীতে সেটি পুষিয়ে নেওয়ার। তবে এভাবে কাজ আটকে থাকলে নির্ধারিত সময়ে শেষ করা কঠিন হবে” বিবিসি বাংলাকে বলেন মি. কাশেম।এতে প্রকল্প ব্যয়ও বেড়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।পাতাল মেট্রোরেল ইতিমধ্যেই দেশের সবচেয়ে ব্যয়বহুল প্রকল্পগুলোর একটি। প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৫২ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা।

পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র: বাংলাদেশ সরকারের অগ্রাধিকার তালিকায় শীর্ষে থাকা মেগা প্রকল্পগুলোর একটি হচ্ছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র।২০১৩ সালের অক্টোবরে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটির নির্মাণের প্রথম পর্যায় কাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।এর একযুগেরও বেশি সময় পর এখন বাণিজ্যিক উৎপাদনের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি।চলতি বছরের শেষদিকে দু’টি চুল্লির একটিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে বলে বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন প্রকল্প পরিচালক ড. শৌকত আকবর।“আশা করছি, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর নাগাদ আমরা উৎপাদনে যেতে পারবো এবং সেই বিদ্যুৎ সরাসরি জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ায় মানুষ সফল ভোগ করতে পারবে” গনমাধ্যমে বলেন আকবর।২০২১ সালের দশই অক্টোবর রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম চুল্লির উদ্বোধন করার হয়।এরপর দুই বছর পর ২০২৩ বছরের অক্টোবরে রাশিয়ার কাছ থেকে জ্বালানির প্রথম চালান বুঝে পায় বাংলাদেশ।কিন্তু বিদ্যুৎ উৎপাদনের যে সঞ্চালন লাইনের মাধ্যমে এটি জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে, সেই লাইন পুরোপুরি প্রস্তুত না থাকায় উৎপাদন যাওয়া সম্ভব হয়নি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*