বিজয় দিবস সংখ্যা: অপরাধের স্বর্গরাজ্য সাইবার দুনিয়া

Posted by

রেফার রিফাত নিলয়/ তথ্য ও প্রযুক্তি: তথ্যপ্রযুক্তির যুগে সময়ের সাথে সাথে প্রযুক্তিভিত্তিক অপরাধ নতুনরূপে আমাদের সামনে এসেছে। তথ্যপ্রযুক্তিও ইন্টারনেট ব্যবহার করে অনলাইনে যেসব অপরাধ সংঘটিত হয় তাকে সাইবার অপরাধ বলা হয়। ইন্টারনেটের সাইবার পরিসরকে ব্যবহার করার মাধ্যমে সাইবার অপরাধের বিভিন্ন দিক রয়েছে। যেমন আইডি হ্যাকিং, উগ্র ও বিদ্বেষপূর্ণ মন্তব্য/অডিও/ভিডিও প্রচার, ফেক অ্যাকাউন্ট তৈরি, সাইবার বুলিং বা হেনস্তা করা, গোপন নথি ও প্রশ্নপত্র ফাঁস, ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতি, অনলাইন মাল্টিলেভেল মার্কেটিং প্রতারণা ও গ্যাম্বলিং, ই-মেইল বা সামাজিক মাধ্যমে হুমকি প্রেরণ, চাঁদাবাজি, বøাকমেইলিং, পর্নোগ্রাফি, ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের তথ্য চুরি, ওয়েবসাইট হ্যাকিং, অনলাইনে প্রতারণা, মানব পাচার, মাদকসহ অন্যান্য অপরাধের জন্য সাইবার পরিসরকে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা ইত্যাদি সাইবার অপরাধের জগতের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত।
বাংলাদেশে গত দুই দশকে উন্নত প্রযুক্তি, সহজে ইন্টারনেট প্রাপ্তি, সাধারণের ইন্টারনেট ব্যবহারের সচেতনতার অভাব ও প্রয়োজনীয় নজরদারির অভাবে দেশে উদ্বেগজনকভাবে সাইবার অপরাধ বেড়েছে। ২০১০ সাল থেকে নিরাপদ ইন্টারনেট পরিসর তৈরিতে সরকার কাজ করলেও একযুগ পরও নিরাপদ ইন্টারনেট তৈরিতে নেয়া নানা উদ্যোগ খুব সফলতার মুখ দেখেছে বলা যাবে না। পরিসংখ্যান বলছে, ইন্টারনেটে সাইবার অপরাধের শিকার সবচেয়ে বেশি হয়ে থাকে শিশু-কিশোর ও নারীরা। সম্প্রতি প্রকাশিত এক জরিপে দেখা যায়, ইন্টারনেটে হেনস্তার শিকার ৮৬ দশমিক ৯০ শতাংশের বয়স ১৮-৩০ বছরের মধ্যে। ১৮ বছরের কম বয়সী ভুক্তভোগী ৮ দশমিক ৯৩ শতাংশ। বয়সভিত্তিক সাইবার অপরাধের বিশ্লেষণে দেখা যায়, এ ধরনের অপরাধে অভিযুক্তদের বেশিরভাগের বয়স ১৮-৩০ বছরের মধ্যে। আক্রান্তদের বড় অংশও কম বয়সী। কাজেই সাইবার পরিসরে তরুণ প্রজন্ম কতটা ঝুঁকি ও নিরাপত্তাহীন রয়েছে তা এ তথ্য থেকেই স্পট। কেবল তরুণরাই নয়, সাইবার পরিসরে বয়োজ্যেষ্ঠরাও আজকাল নিরাপদ নন। ব্যক্তি প্রতিষ্ঠান যেকোনো ক্ষেত্রেই সাইবার অপরাধের শিকার হওয়ার সম্ভাবনা রয়ে গেছে।
এক সমীক্ষায় আমাদের দেশে সাইবার বুলিং বা হেনস্তা সংখ্যায় বিগত সময়ের চেয়ে অনেকটাই বেড়েছে। সাইবার বুলিংয়ের মধ্যে রয়েছে ছবি বিকৃত করে অপপ্রচার, পর্নোগ্রাফি কনটেন্ট, সামাজিক মাধ্যমে অপপ্রচার এবং অনলাইনে মেসেজ পাঠিয়ে হুমকি দিয়ে মানসিক হয়রানি ইত্যাদি। বর্তমানে এ ধরনের অপরাধ ক্রমেই ঊর্ধ্বমুখী। আর নারীরাই এ হীন আক্রমণের শিকার হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। সিসিএ ফাউন্ডেশনের গবেষণায় আরো জানা যায়, বাংলাদেশে সাইবার অপরাধের শিকার হওয়া ভুক্তভোগীদের ৫০ দশমিক ২৭ শতাংশই সাইবার বুলিংয়ের শিকার হচ্ছে।
তথ্যেই যেখানে শক্তি সেখানে আজকের সাইবার অপরাধের অন্যতম আরেকটি ক্ষেত্র হলো তথ্য চুরি ও পাচার। বিশ্বজুড়ে উন্নত দেশগুলোয় সম্প্রতি অন্যান্য অপরাধ কমে গেলেও সাইবার অপরাধের হার ব্যাপকভাবে বেড়েছে। ভিপিএন সংস্থা সার্ফ শার্কের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাইবার হামলা চালিয়ে তথ্য চুরির তালিকায় ২০২১ সালে শীর্ষে ছিল যুক্তরাষ্ট্র। সেখানে ব্যক্তিগত তথ্য চুরি হয়েছে ২১ কোটিরও বেশি নাগরিকের। যুক্তরাজ্যেও সাইবার অপরাধ, ইন্টারনেটে প্রতারণার হার ঊর্ধ্বমুখী। দেশটির ব্যাংকগুলোর ট্রেড সংস্থা ইউকে ফাইন্যান্সের তথ্যানুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে কর সংগ্রহকারীর নাম উল্লেখপূর্বক ফোন করে প্রতারণার হার বেড়েছে কয়েক গুণ। অন্য দেশের মতো এ ধরনের প্রতারণা ও অপরাধের সম্ভাবনা আমাদের দেশেও রয়েছে।
বর্তমানে ইন্টারনেট গ্যাম্বলিং, ই-ট্রানজেকশন, হ্যাকিং এবং ফেক অ্যাপস, অনলাইন প্রতারণার নানা অভিনব কৌশলে অর্থ-সংক্রান্ত সাইবার অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। বস্তুত অর্থ আত্মসাৎ করা ও অর্থ পাচার করাই এ ধরনের অপরাধের মূল্য লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য। বণিক বার্তায় প্রকাশিত প্রতিবেদন জানায়, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) বলছে, ২০২২ সালে চারটি ভিন্ন আইনের অধীনে প্রতি মাসে গড়ে ৩১৩টি সাইবার-সংক্রান্ত মামলা হয়েছে। এর ২৮০টি মামলার মধ্যে ফেসবুক-সংক্রান্ত মানহানির ৯১টি ও পর্নোগ্রাফির মামলা ৫৮টি। এছাড়া হ্যাকিং-সংক্রান্ত ৫১টি, ই-ট্রানজেকশনের ৪২টি, অনলাইন প্রতারণায় ২০টি ও তথ্যপ্রযুক্তির মামলা ১৮টি। সিসিটিসির তদন্ত করা ২৮০টি মামলার মধ্যে অর্থসংক্রান্ত সাইবার অপরাধের মোট মামলা ১৩১টি যা মোট মামলার ৪৭ শতাংশ।
ঢাকাসহ সারা দেশে প্রতিনিয়তই ঘটছে অনলাইন মাধ্যমে প্রতারণা, জালিয়াতি ও ডিজিটাল অপরাধের ঘটনা। মানুষের জাতীয় পরিচয়পত্র জালিয়াতি করে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নেয়ার মাধ্যমে আর্থিক জালিয়াতি করা হচ্ছে। একই সঙ্গে মোবাইল ফোনভিত্তিক অর্থ স্থানান্তর (এমএফএস) বিকাশ-নগদ-রকেটের মতো আর্থিক সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকদের অ্যাকাউন্ট হ্যাক ও তথ্য চুরি করে অ্যাকাউন্ট দখল এবং ব্যাংকের ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতি, প্রতারণা ও এটিএম বুথ হ্যাকিংয়ের ঘটনাও হয়েছে। এছাড়া ই-কমার্সের সাইটের নামে ই-ভ্যালি, ই-অরেঞ্জ, বুমবুম, কিউকম, ধামাকাসহ এমন বেশকিছু ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের প্রতারণা ও অর্থ আত্মসাতের ঘটনাও ঘটেছে সাম্প্রতিক বছরে। ইন্টারনেটভিত্তিক এসব অপরাধে যুক্ত হয়েছে ক্রিপ্টোকারেন্সি মার্কেটের অবৈধ লেনদেন আর অনলাইন জুয়ার নানা প্লাটফর্ম। দেশে ও বিদেশের নানা ধরনের সাইবার অপরাধের শিকার হচ্ছে দেশের জনগণ।
প্রযুক্তির প্রসারে অনলাইন কার্যক্রমে আমরা সবাই ব্যাপকভাবে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি। দ্রæত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক ইকোসিস্টেমে সাইবার অপরাধকে এখন বড় ধরনের অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক নিরাপত্তার পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য এ ধরনের অপরাধকে মনে করা হচ্ছে অন্যতম প্রধান হুমকি। সাইবার অপরাধ প্রতিরোধে দেশে দেশে যুগোপযোগী আইন প্রণয়ন করা হচ্ছে। অনেক দেশে এরই মধ্যে এ ধরনের আইন তৈরি করেছে। আমরাও আইন করেছি। তবে শুধু আইন প্রণয়ন করে ক্ষান্ত হলে চলবে না, আইনের উপযুক্ত ও যথাযথভাবে প্রয়োগ করে দুর্বৃত্তদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা সবচেয়ে প্রয়োজন। তারচেয়ে বেশি প্রয়োজন আমাদের জনসাধারনের মধ্যে নিরাপদে ইন্টারনেট ব্যবহারে সচেতনতা তৈরি করা। সাধারণ ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের ইন্টারনেট সাক্ষরতার সঙ্গে সাইবার পরিসরে নিরাপত্তা ও আইন সম্পর্কে ধারণা তৈরি করতে হবে। সেজন্য ব্যাপকভাবে সাইবার সচেতনতামূলক কার্যক্রম, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সাইবার সিকিউরিটি রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট (সিএসআরএ) সাইবার সচেতনতা বাধ্যতামূলক করা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সাইবার নিরাপত্তার পাঠ অর্ন্তভূক্ত করা, সাইবার সাক্ষরতা বৃদ্ধি, গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা এবং সব পক্ষের সম্মিলিত প্রচেষ্টা থাকলেই সুস্থ ও নিরাপদ সাইবার পরিসর গড়ে তোলা সম্ভব হবে। এটাই হবে সাইবার অপরাধ মোকাবেলায় আমাদের অন্যতম হাতিয়ার।
বর্তমানে আমরা আন্তঃসংযুক্ত বিশ্বে বসবাস করছি। যেখানে ইন্টারনেটের বদৌলতে আমরা মুহূর্তে বিশ্বের যেকোন প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যোগাযোগ করতে সক্ষম। এ প্রেক্ষাপটে সামনের দিনগুলোয় আমাদের ইন্টারনেট নির্ভরতা আরো বাড়বে। একই সঙ্গে নতুন সব সাইবার অপরাধের প্রবণতা বাড়বে। এটা মাথায় রেখে ইন্টারনেটের ব্যবহার সুষ্ঠু ও নিরাপদ যেমন আমাদের নিশ্চিত করতে হবে, তেমনি এর অপব্যবহার ও ইন্টারনেট সংক্রান্ত অপরাধ রোধেও আরো পরিকল্পিত ও সময়োপযোগীভাবে নিজেদের সুসজ্জিত করতে হবে। উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার ও অপরাধ ও অপরাধের ধরন সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি সাইবার অপরাধ তদন্তে আইন ও সংস্থাকে আধুনিকায়ন প্রয়োজন রয়েছে। এক্ষেত্রে অস্থায়ী কোনো পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় আমাদের এখন থেকেই এগোনো প্রয়োজন। এখনকার আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির যুগে জীবনধারার পরিবর্তনের সঙ্গে টিকে থাকার লড়াইয়ে সাইবার নিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেটি অর্জন শুধু আইন প্রয়োগ কিংবা কঠোর পদক্ষেপে নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তার জন্য সর্বোপরি দেশে নিরাপদ ও সুস্থ সাইবার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে এবং এটি করতে সরকারি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। সব অংশীজনের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই তৈরি করতে পারে আমাদের জন্য ইন্টারনেটের নিরাপদ সাইবার পরিসর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*