অনুভবে তুমি

Posted by

না অফিস থেকে বাসায় ফিরেছে অনেকক্ষন। খুব গরম এক কাপ চা খেতে ইচ্ছে করছে কিন্তু বিছানা থেকে নামতেও ইচ্ছে করছে না। কেমন যেন করছে মনটা। ফ্রিজ ভর্তি করে মজার মজার খাবার ভরে রেখেছে। কিন্তু অদ্ভুত আলস্যে কিছু করতে মন চাইছে না। বাতাসে চাইম বেলের মিস্টি আওয়াজটা আরও মনে হয় ক্লান্ত করে দিচ্ছিল কনাকে।

কনার এই ফ্লাটটা নিজে কিনেছে। খুব বড় নয় আবার ছোটও নয়। নিজের মতো গুছিয়ে নিয়েছে। একটা ফ্লাটে যাযা থাকা দরকার সবই আছে কনার ফ্লাটে। কনার এই ফ্লাট সাজাতে আর্যও অনেক কষ্ট করেছে। ওর জামানো সব টাকাই কনাকে দিয়ে দিয়েছিলো আর্য। কিউট একটা গাড়ীও কিনেছিলো আর্য ওর জন্য। সময় পেলেই দুজনে বের হয়ে যেত ঘুরতে। নানান রকম বায়না করতো কনা আর্যর কাছে। সব মিটাতো।

কনার ক্লান্ত শরীরে চারিদেকে বিছানোয় চিৎ হয়ে শুয়ে সব দেখছিলো। রুমের এসিটার সুইং মুড দিয়ে একটা ঠান্ডা বাতাস কনার শরীর ছুয়ে যাচ্ছিল। বিছানার যে পাশে ও শুয়ে ছিলো সেই পাশে সোজাসুজিভাবে তাকালে ঘড়ির দিকে চোখ চলে যায়। ঘড়িতে এখন প্রায় রাত আটটা। এইতো আর কিছুক্ষনের মধ্যে আর্যর আসার সময় হয়ে এসেছে। আর্য এলেই কনার সারা শরীর জুড়ে ভালবাসা খেলা করে। আসলে আর্য আর কনা , কনা আর আর্য একটাই আত্মা।

বিছানা থেকে সোজা উঠেই ফ্রেশরুমে গিয়ে শাওর নিলো। গুনগুন করে গান গাইলো। আর্যর প্রিয় গানটা- ‘তখন তোমার একুশ বছর বোধহয়, আমি তখন অষ্টাদশীয় ছোঁয়ায়, লজ্জা জড়ানো ছন্দে কেঁপেছি ধরা পড়েছিলো ভয়। গোপনের প্রেম গোপনে গিয়েছে ঝরে,আমরা দুজনে কখন গিয়েছি সরে। ফুলঝুরি থেকে ফুল ঝরে গেলে মালা কিসে গাঁথা হয়?’

অগুছালো লাল শাড়িটা বের করে আবার গান ধরলো কনা এটাও আর্যর খুব প্রিয় গান। সব মুখস্থ করে রেখেছে কনা। বাইরে বের হলেই গাড়িতে বাজাতো আর্য ‘চোখের আলোয় দেখেছিলেম চোখের বাহিরে। অন্তরে আজ দেখব যখন আলোক নাহি রে, ধরায় যখন দাও না ধরা হৃদয় তখন তোমায় ভরা, এখন তোমার আপন আলোয় তোমায় চাহি রে, তোমায় নিয়ে খেলেছিলেম খেলার ঘরেতে। খেলার পুতুল ভেঙে গেছে প্রলয় ঝড়েতে। থাক্ তবে সেই কেবল খেলা, হোক-না এখন প্রাণের মেলা তারের বীণা ভাঙল, হৃদয়-বীণায় গাহি রে।’

কনা লাল টিপটা পড়ে আর্যর মনের মতো করে নিজেকে গুছিয়ে সাজিয়ে পরিপাটি করে ফুটিয়ে তুলল। এইতো আর কিছুক্ষন পর আর্য চলে আসবে। ড্রয়ংরুমের দরজা খুলতে গিয়ে মনে হলো আর্য প্রায়ই বলতো হুটুপুটু আমি যখনই অফিস থেকে আসবো তখনই যেন তোমাকে সাজুগুজু করে থাকতে দেখি। গত দুইবছর মনের মতো করে সেজে থেকেছে কনা। ভিষন ভালবাসে আর্যকে কনা। ও যখন অফিস থেকে আসতো কনা তখন সারাক্ষন আর্যর পাশে পাশে থাকতো। সুযোগ পেলেই আর্যর মাথার চুলগুলো এলামেলো করে দিতো। এইতো আর্য চলে এসেছে।

গত ছয়মাস একবারের জন্যও মনে হয়নি কনার আর্য নেই। সেদিনের কথা, দৃশ্যগুলো এখনো মনে আছে কনার। লাল শাড়ি ছিলো আর্যর খুব প্রিয়। প্রত্যেক সপ্তাহের ছুটির দিনে দুইজনেই বের হয়ে যেতো ঘুরতে। সেবারও তাই। মাওয়া রোড দিয়ে পদ্মা পাড় হয়ে শিবচরের কাছেই গাড়ি ঘোরাতে গিয়ে কনা বলল খুব ডাব খেতে ইচ্ছে করছে। গাড়ি দরজা খুলেই রাস্তার বিপরীত দিকে আর্য দৌড় দিয়ে কনার জন্য ডাব আনতে গিয়ে পিছন দিকে দিয়ে একটা বড় বাস মুহুর্তে আর্যকে উড়িয়ে দিয়ে ফেলে দিলো রাস্তার উপরে। আর্যর মাথাটা একটা শব্দ করে ফেটে গিয়ে অনেক দূর ছড়িয়ে পড়েছিলো মাথার ঘিলু।

লেখক পরিচিতি: রেজা নওফল হায়দার। পেশায় সাংবাদিক। নীলাম্বরী ছোট গল্পের বই এর লেখক। ছোট গল্প ও দ্রোহের কবিতা লিখতে স্বাচ্ছ্যন্দবোধ করেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*