সে

Posted by

পর্ব : ০২

সুরাইয়া পারভীন। খায়রুল সাহেবের ঢাকার অফিস টা খুব একটা বড় নয়। তবে ছিমছাম, গোছানো। স্টাফ বলতে মোটে চারজন। ভ্রাম্যমান টিচার ও কাজের ছেলে দুজন। বেশ কয়েকখানা রুম, আর শুরু টা সোফা ও মেঝে কার্পেট দিয়ে মোড়ানো। বিভিন্ন ডিপ্লোমেটিক কোর্স এখানে টিচার দিয়ে পড়ানো হয়। এবং কোর্স শেষে সার্টিফিকেট দেওয়া হয়। জেসমিনের হাতের লেখা বেশ ভাল ছিল,সবধরনের সার্টিফিকেট লেখার দ্বায়িত্ব ওর ওপর ছিল। অন্যান্য স্টাফ এর মধ্যে ছিল আবেদ,শাহিনা আর জালাল সাহেব। শাহিনা প্রায়ই তার বাচ্চা নিয়ে অফিস করত। আবেদ প্রশাসনিক হিসাব নিকাশ দেখত আর জালাল সাহেব পুরো অফিসিয়াল বিষয়গুলো মেইনটেইন করত। জালাল সাহেবের প্রতি বসের অগাধ নির্ভরতা ছিল। জেসমিনের নির্দিষ্ট করে কোন বসার জায়গা ছিল না,কখনও বসের রুমে, কখনও শাহিনা আপুর সামনে,কখনও সোফায় বসে সময় কাটত। মিজান ও খলিল দুই কর্মচারী সদর দরজা ও বসের রুমে ঢোকার দরজা পাহারা দিত। আজকে অনেক দিন পর পিয়া ম্যাডাম এসেছে,বসের দরজা বন্ধ, অনুমতি ব্যতিত এই সময় অন্য কারো প্রবেশ নিষেধ। জেসমিনের বেশ তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, সে বস কে জানতে চায়। আসলে তার চরিত্র কোন পর্যায়ের খারাপ সেটা ও আঁচ করতে চায়। আজকে ও শাহিনা ম্যাডামের সামনের চেয়ারে বসেছে।যাতে কোন ক্রমে দরজা খুলে গেলে ভেতরে কী হয় সেটা ও কিছুটা হলেও দেখতে পায়। না দরজা প্রায় হাফ এন আওয়ার বন্ধ। ওর মাথায় হঠাৎ দুষ্ট বুদ্ধি চাপল। চট করে কিছু আনবার বাহানায় দরজার নব ঘুরিয়ে দিল,আর সত্যি দরজা খুলে গেল। এ সময় দাড়োয়ান টা ও কিছু সময় কোথায় যেন চলে গিয়েছিল। আসলে কেউই সাহস করেনা কখনও দরজা খোলার। হয়তো দাড়োয়ান সে জন্য কিছুটা কম সিরিয়াস ছিল। পিয়া ম্যাডাম সামনের সিটেই বসে আছে,তবে তার শরীরের থলথলে মাংস গুলো পাতলা শাড়ীর ভাঁজে ভাঁজে যেন কারুকার্য হয়ে শোভা পাচ্ছে বসের চোখে,জিভে। কী জানি বসের রেষ্ট নেবার ছোট্ট রুমে এতক্ষণে ঘটেছে কিনা কিছু। তাদের দু’জনের ই বেশ হ্যাপী হ্যাপী চেহারা। জেসমিন রুমে ঢোকায় বস তেমন রিএক্ট করল না। মনে হল তাদের কথপোকথন শেষ। বস জেসমিনকে বলল একজন স্টুডেন্ট এর সার্টিফিকেট লিখতে হবে। সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ পেপারস বসের রেষ্ট নেবার রুমে আলমিরাতে থাকে। বস ওকে ওখান থেকে ফরমেট খুঁজে আনতে বলল। কী করা জেসমিন আলমিরা খুঁজতে লাগল।কিন্তু খুঁজে পাচ্ছেনা। পিয়া ম্যাডাম ততক্ষণে বিদায় নিয়েছে। জেসমিন বসকে জানাল ও পেপার পাচ্ছে না। তখন বস এসে ওকে হেল্প করল। পেপার খুঁজে পাওয়া গেল। জেসমিন ওর শরীরের খুব কাছে বসের গরম নিঃশ্বাসের শব্দ পেল। খুব দ্রুত জেসমিন রুম থেকে বেরিয়ে গেল।

আজ বাবার মন টা খুব বেশি খারাপ। শরীর টা বোধহয় আর টিকবে না। নিয়মিত থেরাপি দিলেও সবসময় সমস্যা লেগেই আছে। জেসমিন তার জায়গা থেকে সর্বচ্চো চেষ্টা টুকু চালাচ্ছে। বড়ভাই ধুম করে একটা বিয়ে করে ফেলেছে। মেয়েটির পারিবারিক পরিচয় সম্পর্কে তেমন কিছুই ওরা জানেনা। এছাড়া ও কী চাকরী করে তাও জেসমিনের পরিবার জানেনা, বা বলেই না বলা চলে। জেসমিনের মুখের দিকে তাকালে বাবার মনটা হু হু করে কেঁদে ওঠে। কোন সুব্যবস্হাই তিনি মেয়েটার জন্য করে যেতে পারলেন না। জেসমিনের মা আমেনা বেগমের জন্য ও তার দুঃখ হয়। জেসমিন বাইরে বের হবার সময় একবার বাবার সাথে দেখা করে,আজও দেখা করতে গেলে বাবা মেয়েকে জিজ্ঞেস করল-“কেমন আছিস মা”? “ভাল বাবা”! ব্যস কথা আর বাড়াতে দিলনা। দ্রুত আসি বলে ও বেরিয়ে পড়ল। পাসপোর্ট অফিসে যেতে হবে ছবি তুলতে, একটা হোস্টেলে থাকার জন্য বস কথা বলে রেখেছে,সেখানেও যেতে হবে। আসলে সেদিন অফিসে হঠাৎ করেই দুটো পেপারস সামনে এগিয়ে দিল বস,ফিলাপ করার জন্য।একটা তার আর একটা আমার। আমাকে বলা হলো আমি যেন পাসপোর্ট টা করে রাখি। আর কাজের সুবিধার জন্য বাসা ছেড়ে অফিসের কাছাকাছি এই হোস্টেলে উঠি। ইউনিভার্সিটি তে তেমন ক্লাস করতে পারা যায়না বলে লেখাপড়া টা আপাতত সিঁকেয় উঠেছে, সেদিনের পর থেকে রাহাতের সাথেও আর দেখা হলোনা। জেসমিন সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগলেও বুঝতে পারছিলনা কি করবে,কি করবে, তারপর বসের কথা ধরেই এগুতে লাগল। একটা চোরাবালি তবু যেন কিভাবে জেসমিন হাঁটছে। অফিসে জেসমিনের আলাদা গুরুত্ব আছে। অন্যান্য সবাই ওকে সমীহ করে। কর্মচারী দু’টো ও আপা আপা বলে গলা ফাটায় ফেলে, জেসমিন সুখের স্বাদ পেতে থাকে,আর ও ধীরে ধীরে বসের প্রতি একটা গোপন সন্ধিতে আটকে পড়ে,ভাষা নেই কিন্তু নিবেদন আছে ঠিক এমন,কেমন জানি অবাধ্য হতে পারেনা। বস পাসপোর্ট অফিসে ছিল। সবটা ঠিকঠাক মিটে গেল। কয়েকদিনের মধ্যে ই হোস্টেলে উঠতে হবে। সব খরচই বস দিবে। জেসমিন কী বসের প্রতি দূর্বল হয়ে পড়ছে, জীবনের সব হিসেব নিকেশ কী এখানে বাঁধা পড়ে যাচ্ছে,জেসমিন বিলাসিতায় ডুবে যেতে যেতে সস্তা সামাজিক সেন্টিমেন্ট ভুলতে বসেছে,কিংবা মনকে বারবার বোঝাচ্ছে তার কিছু করবার নেই,তার সুখী হবার অধিকার আছে। রাহাত তো কখনও ভাল লাগার কথা মুখ ফুটে বলেনি। ওর জন্য তো ভাবে এমন তো কখনও প্রকাশ করে নি। মাঝে মাঝে জীবন নিয়ে ভাবলে চোখে জল ভরে ওঠে। তারপর আবার শক্ত হয়ে ওঠে মন। ভাল থাকার অধিকার ওর রয়েছে। যেভাবেই হোক,এছাড়া বাবার চিকিৎসা! তাই আর ভাবেনা এখন জেসমিন। বরং কিছুটা আনন্দে কাটে ওর সময় এখন। বেশ সময় নিয়ে সাজে,গুনগুন গানের আওয়াজ তোলে,বেশ ফুরফুরে মন থাকে এখন। ইদানীং বস গাড়ীতে সবসময়ই ওর হাত ধরে বসে। অস্বস্তি টা আর হয় না,ভালই লাগে ওর। মাঝেমাঝে ওরা চাইনিজে খায়। আজ একজন বিদেশি বায়ার এসেছে,জেসমিনের ব্যাপারে ওদের মধ্যে বোধহয় কথা হলো,অস্পষ্ট তবে বুঝতে তেমন অসুবিধা হলো না। বস জেসমিনকে জানাল তাড়াতাড়ি হোষ্টেলে উঠতে আর শীঘ্রই তারা বিদেশে যাবে,যেন মানসিক ভাবে তৈরি থাকে ও।

বড়ভাইয়ের বউ আসাতে বাসার পরিবেশগত প্যাটার্ণ কিছুটা চেঞ্জ হয়েছে, বাবাকে দেখা শুনা নতুন বউ ই করে এখন। যার ফলে বাসার সবাইকে বুঝিয়ে ওর হোস্টেলে ওঠাটা একটু সহজ হয়েছে। যদিও বাবা ছাড়া ওর জন্য অন্যদের ভাবনা তেমন প্রকট নয়,বাবা মেয়েটার ভবিষ্যৎ নিয়ে খুবই চিন্তিত। জেসমিন তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে সোজা হোটেলের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ল। আজ বায়ারের সাথে মিটিং, বস থাকবে, বস চায় তার সব কাজে ও যেন পাশে থাকে। মোটামুটি জ্যাম ঠেলে ঠিক এগারোটায় পৌঁছে গেল ও। বসের মেজাজ বেশ ফুরফুরে মনে হচ্ছে। তার মানে তারা আরো কিছু নতুন কাজের অর্ডার পাচ্ছে। সব কথা শেষে বায়ার জেসমিনের সাথে করমর্দন করল,আর মিটিং শেষে স্পেশালি বলল,”সী ইউ”। ও একটু অস্বস্তির সাথেই বলল,”ইয়া”। ওরা একই সাথে গাড়ীতে উঠল। বস যেন একটু বেশিই খুশি। হাত ধরার সাথে আর একটু চেপে জেসমিনকে কাছে টেনে নিল, আর অতি আবেগে বলে ফেলল,”ও ডিয়ার” জেসমিনের চোখের কোণায় এক ফোঁটা অশ্রু জমাট বাঁধল। কেউই বুঝল না শুধু নিজে ছাড়া। অফিসে পা দিতেই নতুন বিপদ। বসের স্ত্রী বসে আছে। বস একেবারেই অন্য মানুষ হয়ে গেছে,জেসমিন একজন সামান্য কর্মচারী এমন ভাব ভঙ্গিতে জেসমিনকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে স্ত্রী কে নিয়ে বেশি পর্যায়ে মাখামাখি শুরু করে দিল। সাধারণত বসের স্ত্রী কখনও অফিসে আসেনা। মেয়েটির ব্যাপারে এত বেশি শুনেছে যে ওকে দেখার উদ্দেশ্যেই তার অফিসে আসা। আতিথীয়তা শেষে যাবার সময় বলে গেল,”এই মেয়েটিকে সে যেন আর দ্বিতীয় দিন না দেখে”। অফিসের অন্য সবাই-ই বেশ খুশি। জেসমিনের স্পেশাল গুরুত্ব সবার কাছেই অস্বস্তিদায়ক ছিল। জেসমিনের ছোট্ট বাটন ফোনে হঠাৎ অসময়ে রিং হলো। বাসা থেকে বড়ভাই। ও তড়িঘড়ি করে বসকে না বলেই বেরিয়ে গেল। বাবা আর নেই। বাবার করুণ মুখখানা এক অতৃপ্তির কষ্ট নিয়ে চোখ বুজে আছে। জেসমিন কান্নায় ভেঙে পড়ল। ওদিকে বড়ভাই কি কাজ করে তা ওদের পরিবারের কারোই জানা ছিলনা। ঠিক সিনেমার মতই হলো,এমন মুহুর্তে বাড়িতে পুলিশ এল। ঘর তল্লাশি করে মাদক পাওয়া গেল। বড়ভাইকে পুলিশে ধরে নিয়ে গেল। মায়ের কোন হুশ নেই। পোয়াতি ভাবী বিছানায় পড়ে গেল। একমাত্র জেসমিনই হুশে থাকল, ছোট অবুঝ ভাইটাকে নিয়ে পাড়াপ্রতিবেশির সহায়তায় বাবার যাবতীয় কাজ ও সমাপ্ত করল। অবশ্য বস এসেছে। এমন মুহূর্তে বসকে পাশে পেয়ে জেসমিন তার বুকের সমস্ত কান্না উগরে দিল। বস ওকে স্বান্তনা দিল। ভয় নেই,”আমি আছি”শুধু এই ছোট্ট কথায় বস জেসমিনকে আশ্বস্ত করল।

জেসমিন ও বস মুখোমুখি বসে আছে। বস ই প্রথমে কথা বলল। বসের বিবাহিত জীবন বলতে তার দুই কন্যা ও ছোট একটি ছেলে রয়েছে। স্ত্রী র সাথে সম্পর্ক তেমন ভাল নয়। বলা যায় শীতল স্রোতের মত। তার জীবনের চাওয়া গুলো যেমন ছিল ঠিক তেমন নয়। বস বলল জেসমিনের মধ্যে সে ধরনের সব গুনাগুন রয়েছে,যা খায়রুল সাহেব কে আকৃষ্ট করেছে। সে জেসমিন কে বিয়ের প্রস্তাব দিল। জেসমিন আনমনা হয়ে রয়েছে। ও রাহাতের কথা ভাবছে। বুঝতে পারে দু’জন দু’জনকে পছন্দ করে,কিন্তু পারিবারিক ব্যবধান কাউকেই সাহসী করে তুলতে পারেনা।সত্যি বলতে রাহাত পারেনি কখনও ওর পছন্দের কথা জেসমিনকে বলতে। ফলে জেসমিনের ছিল দোলাচলের জীবন। সে জীবন নিয়ে এখন আর ভাবতে পারেনা। অসহায় মন একটা সুরক্ষিত রক্ষাকবচ চায়। যদি সবটা জৌলুসের মধ্যে দ্বিতীয় স্ত্রী হয়ে গুরুত্বের সাথে থাকতে পারে তবে জেসমিন তেমন কোন সমস্যা দেখেনা। বিভিন্ন কাজে একসাথে থাকতে থাকতে এক ধরনের নির্ভরতা কেন জানি ওর তৈরি হয়েছে বসের প্রতি। ছোট ছোট গিফট, কথার গুরুত্ব, কেনাকাটায় মতামতের প্রাধান্য সবটা মিলে ও বস কে ছাড়তে পারবে না বলে ওর মনে হয়েছে। জেসমিন রাজি হয়ে গেল। তারপর একদিন ওদের বিয়ে হয়ে গেল। বসের অফিসে এখন জেসমিনের ছবি শোভা পায়,এমন কি ওরা হানিমুন করতে বিদেশে গেল। সেখানে বেশ কিছু ব্যবসায়িক ডিল ও হলো। মিঃ হ্যারী জেসমিনকে বেশ পছন্দ করল। যেহেতু জেসমিনের শিক্ষাগত যোগ্যতা ভাল ছিল,বস এটাকে তার ব্যাবসায়িক পরিসরে ভালই কাজে লাগাল। জেসমিন পোশাকে বেশ স্মার্ট হয়ে উঠল। বলতে গেলে চেনাই যায়না এখনকার জেসমিনকে। বস খুবই সূক্ষ্মতম কৌশলে জেসমিনকে ব্যবহার করতে লাগল। মিঃ হ্যারী বাংলাদেশে আসার প্রতিশ্রুতি দিল বসকে। জেসমিন বুঝতেও পারল না ও কী খেলার শিকার হতে চলেছে।

লেখক: সুরাইয়া পারভীন।পরিচিতি: লেখক পেশায় একজন ব্যংক কর্মকর্তা। কবিতা লিখতে ভালবাসেন। অমর একুশে ২০২০ বইমেলায় লেখকের কবিতার বই প্রকাশ পায়। লিখছেন ছোট গল্প সমকালীন জীবনের ঘটনা নিয়ে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*