একটি মানবিক গল্প

Posted by

কাঁপা কাঁপা হাতে খাবারটা কিনেছিলেন আমেনা আপা। তিনদিন খুব জ্বর ছিল, অফিসে যাননি। ফোন করেছিলেন বিভাগীয় প্রধান, ফোনে শুধু বলতে পেরেছিলেন খুব জ্বর শুয়ে আছি।

এই তিন দিন পেটে কিছুই পড়েনি। বাসা থেকে একটু দূরে রংধনু হোটেল থেকে খাবার কিনে এনেছেন।

বাসায় এসেই ধপাস করে বসে পড়লেন, খাবারের প্যাকেটটা সরিয়ে রাখলেন বেশ দূরে। ক্ষুধা লেগেছে। আবার খেতে ইচ্ছে করছে না। রহিমা চাচীর কথা মনে পড়ছে। তার প্রথম ঢাকায় পা রাখার পর এই রহিমা চাচি পরম মমতায় তাকে আশ্রয় দিয়েছিলেন।

পটুয়াখালী থেকে প্রথম যখন তিনি ঢাকায় এলেন তখন সদরঘাটের কাছে বাহাদুর শাহ পার্কে বসে ছিলেন তিনি। কি করবেন কার কাছে যাবেন কি উপায় হবে ভাবতে ভাবতে মনে মনে কান্না করছিলেন। চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ছিল অশ্রু।

সকালে পার্ক পরিষ্কার করতে এসেছিলেন রহিমা চাচি। আমেনা আপার এই আলুথালু বেশ আর ফুপিয়ে ফুপিয়ে কান্নার অর্থ সেদিন বুঝেছিলেন এই মানবিক মানুষটা আর পার্কে থাকা দুটো কুকুর। কুকুর দুটো একটু সময়ের জন্য আমেনা আপাকে ছেড়ে যায়নি। রহিমা চাচি আমেনা আপাকে তার ঘরে আশ্রয় দিয়েছিলেন। শিখিয়েছিলেন ঢাকার মানবিক অমানবিক দুটো দিকই। সেই থেকে আমেনা আপা ঢাকায় রয়ে গেলেন কাটিয়ে দিলেন এক যুগ।

প্রথমদিকে এই আজব ঢাকার ভাষা বুঝতে সময় লেগেছিল। তারপর খুব সহজ হয়ে গেল গোলকধাঁধার সূত্রগুলো। সহজে মানিয়ে নিলেন। এখন আমেনা আপা বেশ নামকরা ক্লিনিকে চাকরি করেন বেতন পান বেশ ভালই। রহিমা চাচিকে আমেনা আপা সম্মান করেছিলেন ভালোবেসে ছিলেন। গতবছর হঠাৎ অসুস্থ হয়ে তিনি মারা গেলেন। সেই থেকে খুব একা তিনি। কাজের চাপে একাকীত্বটা বুঝতে পারেননি। আজ খুব কষ্ট হচ্ছে।

অফিসে আমেনা আপার একটা সুনাম আছে। সবাই আমেনা আপা কে সম্মান করেন। আয়া-বুয়া, অফিস স্টাফ, পিয়ন, অফিস কর্মকর্তা, ডাক্তার, মালিক সবাই তাকে বিশেষভাবে চেনেন। আমেনা আপা সবাইকে তার মত করে সম্মান করেন। রোগীরা এলেই পরিচিত হয়ে যান আমেনা আপার সাথে। খুব ভালো মানুষ আমেনা আপা।

তেমন একটা ছুটি নেননি তিনি। কিন্তু এই জ্বরে আমেনা আপা কষ্ট পেলেন। রহিমা চাচীর কথা মনে পড়ছে আর খুব কান্না পাচ্ছে। একটু শান্ত হয়ে আমেনা আপা তাকালেন খাবার প্যাকেটের দিকে। একটু উঠে গিয়ে খাবার প্যাকেটটি কাছে নিয়ে এলেন। তারপর একবিন্দু খাবার পড়ে রইল না, গোগ্রাসে গিললেন, পানি খেলেন। মনটা হালকা হয়ে গেল। তাৎক্ষণিক ফিরে এলো শক্তি। সব ভুলে গেলেন। গোসল করে ভালো জামা পরে বেরিয়ে গেলেন অফিসের উদ্দেশ্যে।

গল্পের নাম: খাবার। লেখক: রেজা নওফল হায়দার। ৩১ অক্টোবর ২০২০/ ১৩ কার্তিক ১৪২৭

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*